করোনার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের চেয়েও যেভাবে সফল পুয়ের্তো রিকো

দরিদ্র, ক্ষতবিক্ষত এক দ্বীপ পুয়ের্তো রিকো। এই ক্যারিবিয়ান দ্বীপটি আনুষ্ঠানিকভাবে পুয়ের্তো রিকো কমনওয়েলথ হিসেবে পরিচিত। অনেক বাধা-বিপত্তি স্বত্বেও এই দ্বীপটি করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে বেশ সফলই বলা চলে। যুক্তরাষ্ট্রের মতো শক্তিধর একটি দেশও যখন করোনার হানায় নাজেহাল তখন পুয়ের্তো রিকো বেশ ভালোভাবেই পরিস্থিতি সামাল দিতে পেরেছে।

২০১৭ সালে ঘূর্ণঝড় মারিয়ার আঘাতে পুয়ের্তো রিকোতে প্রায় তিন হাজারের মতো মানুষ প্রাণ হারায়। সে সময় থেকে প্রায় ১১ মাস ধরে বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন অবস্থায় ছিল ওই দ্বীপের মানুষ। গত চার বছর ধরে এ অঞ্চলের মানুষ ভয়াবহ বিদ্যুৎ বিভ্রাটের মধ্য দিয়ে দিন কাটাচ্ছেন।

২০১৯ সালের শেষ দিকে এবং ২০২০ সালের গোড়ার দিকে দ্বীপটিতে ভূমিকম্প আঘাত হানে। এর প্রায় দুই মাস পর যখন প্রথম করোনার প্রাদুর্ভাব শুরু হলো তখনো পুয়ের্তো রিকো আগের দুর্যোগকালীণ ক্রান্তিলগ্নই পার করতে পারেনি। তখনও সেখানকার হাসপাতালগুলোর বেহাল দশা। প্রায় শতকরা ১৫ ভাগ চিকিৎসক ঘূর্ণিঝড় মারিয়ার পর মূল ভূখণ্ডে পালিয়ে যান। এছাড়া ভূমিকম্পের কারণেও অনেক বেসরকারি হাসপাতাল বন্ধ হয়ে যায়।

সে সময় পুয়ের্তো রিকোর অনেক বাসিন্দাই তাঁবু টাঙ্গিয়ে থাকতে শুরু করেন। আর এতে রোগ সংক্রমণের হার বৃদ্ধি পেয়েছে। তখন করোনা মহামারি পুরো দ্বীপে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেন অনেকেই।

আমেরিকার এই অঞ্চলে প্রায় ৩৩ লাখ মানুষের বসবাস। এই দ্বীপটি ফ্লোরিডা থেকে প্রায় এক হাজার মাইল (১৬শ কিলোমিটার) দক্ষিণ পূর্বাংশে অবস্থিত। আমেরিকার অধিকাংশ এলাকার চেয়েই পুয়ের্তো রিকোর অবস্থা বেশ ভালো বলা যায়। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের চেয়ে এই দ্বীপে সংক্রমণের হার ছিল খুবই কম (২০২০ সালের ২১ জানুয়ারি থেকে প্রতি এক লাখে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৫ হাজার ৮৪৩)।

অবশ্য পুয়ের্তো রিকোতে আক্রান্তের সংখ্যা কম হওয়ার পেছনে আরও একটি কারণ হতে পারে কম পরীক্ষা করা। করোনায় আক্রান্তের হার কতটা (কতজন করোনায় আক্রান্ত হচ্ছে) এর একটি নির্দেশক হলো কত দ্রুত করোনা ছড়িয়ে পড়ছে এবং পর্যাপ্তভাবে শনাক্তকরণের কাজ হচ্ছে কিনা। পুরো মহামারির এই সময়ে গত ১৫ নভেম্বর পর্যন্ত পুয়ের্তো রিকোতে করোনায় আক্রান্তের হার ৫ থেকে ৭.৯ শতাংশ। পুয়ের্তো রিকোতে করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলেই মনে করছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।

২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত পুয়ের্তো রিকোতে করোনায় প্রায় ৩ হাজার ২৫৮ জনের মৃত্যু হয়েছে (প্রতি ১ লাখে এ সংখ্যা ১০২ জন)। কিন্তু আমেরিকার বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে এ সংখ্যা যেমন- ভারমন্টে (৬০), হাওয়াইতে (৬৮) ও মাইনে (৯২)। এসব অঙ্গরাজ্যে মৃত্যুর সংখ্যার কম হলেও সংক্রমণ ছিল অনেক বেশি। পরিসংখ্যানভিত্তিক ওয়েবসাইট ওয়ার্ল্ডোমিটারের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে এখন পর্যন্ত আক্রান্তের সংখ্যা ৪ কোটি ৮৮ লাখ ৩৫ হাজার ২১৬। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত মারা গেছে ৭ লাখ ৯৬ হাজার ৩১৯ জন। তবে এখন পর্যন্ত মোট সুস্থ হয়ে উঠেছে ৩ কোটি ৮৭ লাখ ৯ হাজার ৭০৪ জন।

পুয়ের্তো রিকোর এক পঞ্চমাংশ অধিবাসীর বয়স ৬৫ বা এর বেশি, যা পুরো আমেরিকার তুলনায় ১৬ শতাংশ। বিদ্যমান এই পরিস্থিতি পুয়ের্তো রিকোর করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি আরোও বাড়িয়েছে। আর আমেরিকার অন্যান্য রাজ্যের চেয়ে ওই দ্বীপে দারিদ্র্যের হার চারগুণ বেশি। এখানকার জনসাধারণ শতকরা ৪৪ ভাগ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে।

অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগতে পারে যে, পুয়ের্তো রিকো কিভাবে এত ভালো করছে? আসলে করোনা মহামারির শুরু থেকেই এই দ্বীপটি কঠোর লকডাউন জারি করেছে যা যুক্তরাষ্ট্রের অনেক অঙ্গরাজ্যই করতে ব্যর্থ হয়েছে। ২০২০ সালের মার্চে ওই অঞ্চলে করোনার প্রাদুর্ভাবের দুদিনের মাথায় পুয়ের্তো রিকো সরকার লকডাউন জারি করে।

অনাবশ্যক ব্যবসা বন্ধ রেখে রাত ৯টা থেকে ভোর ৫টা পর্যন্ত কারফিউ জারি করা হয়। কেউ এই নিয়ম ভঙ্গ করলে তাকে পাঁচ হাজার ডলার জরিমানা এবং ছয় মাসের কারাদণ্ডের নির্দেশ দেওয়া হয়। ফেডারেল ইমার্জেন্সি এজেন্সির ব্রিস একোস্টা বলেন, করোনা মহামারি শুরুর প্রথম দিকেই পুয়ের্তো রিকো জোরালো ও কঠোর কিছু ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। আমি মনে করি, এই বিষয়গুলো শুরুতেই করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বেশ সহায়ক হয়েছে। লকডাউন প্রায় বছর খানেক জারি রাখা হয়েছে। হাওয়াই বাদে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য অঙ্গরাজ্যে যখন গ্রীষ্মে সব খুলে দিয়েছে তখনো পুয়ের্তো রিকো এই বিধিনিষেধ বহাল রেখেছে।

ওই অঞ্চলে ভ্রমণের ক্ষেত্রেও সীমাবদ্ধতা আনা হয়। পুরো করোনার সময় জুড়েই প্রমোদতরীতে যাত্রী পরিবহন বন্ধ ছিল। এমনকি এই বছরের আগস্ট পর্যন্ত ভ্যাকসিন গ্রহণ করা ব্যক্তিদেরও পুয়ের্তো রিকোতে প্রবেশ করার অনুমতি ছিল না। ২০২০ সালের মার্চ মাসে অন্যান্য স্থান থেকে পুয়ের্তো রিকোতে বাণিজ্যিকভাবে ফ্লাইটে আসা যাত্রীদের সান জুয়ান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে স্বাস্থ্য পরীক্ষার কর্মসূচি চালু করা হয়। বর্তমানে পুয়ের্তো রিকোতে ভ্রমণকারী সকল যাত্রীকে করোনা পরীক্ষার নেগেটিভ সনদ বা ভ্যাকসিন গ্রহণের প্রমাণ দেখাতে হবে।

আমেরিকার মূল ভূখণ্ড থেকে অনেকটা বিচ্ছিন্ন অঙ্গরাজ্য আলাস্কা। করোনা পরিস্থিতিতে আলাস্কাও বেশ ভালো করেছে। আমেরিকার অন্যান্য অঙ্গরাজ্যের তুলনায় সেখানে মৃত্যুর হার কম ছিল (প্রতি ১ লাখে ১০৯ জন)। একই অবস্থা আরও দুই অঙ্গরাজ্য ভার্জিন দ্বীপে (৭৯) ও হাওয়াইতে (৬৮)।

তিনটি অঙ্গরাজ্যেই অভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিক ভ্রমণে সীমাবদ্ধতা ছিল। হাওয়াইতেও একই রকম কঠোরতা জারি ছিল। সেখানে কিছু পর্যটক কোয়ারেন্টাইন না মানার কারণে গ্রেফতারও হয়েছিলেন। অভ্যন্তরীণ ভ্রমণকারীদের এখনো কোয়ারেন্টাই এড়াতে বা উত্তর সমুদ্র উপকূলে সময় কাটাতে করোনার নেগেটিভ সনদ বা ভ্যাকসিন নেওয়া হয়েছে এমন কার্ড দেখাতে হচ্ছে।

তবে এসব কিছুর পরেও গত কয়েক মাসে হাসপাতালগুলোতে করোনায় আক্রান্ত হয়ে ভর্তির সংখ্যা বেড়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে হাসপাতালগুলো অতিরিক্ত রোগীর চাপ নিতে পারছে না। তবে পুয়ের্তো রিকোতে এমন ঘটনা দেখা যায়নি।

বিশাল আকারে ভ্যাকসিন কার্যক্রম এই সমস্যা সমাধানের অন্যতম উপায় বলে মনে করা হচ্ছে। পুয়ের্তো রিকো হলো আমেরিকার সবচেয়ে বেশি টীকা গ্রহণকারী অঞ্চল। ১৬ নভেম্বর পর্যন্ত এই দ্বীপের শতকরা ৭৪ ভাগ মানুষ ভ্যাকসিনের দুই ডোজ গ্রহণ করেছেন (আমেরিকায় গড়ে এই হার ৫৯ শতাংশ)।

ভ্যাকসিন গ্রহণের ক্ষেত্রে বেশ ভোগান্তির মধ্যে পড়েছে হাওয়াই, আলাস্কা ও ভার্জিন দ্বীপের বাসিন্দারা। এসব অঙ্গরাজ্যে ভ্যাকসিন গ্রহণকারীর সংখ্যা যথাক্রমে ৬০ শতাংশ, ৫৪ শতাংশ এবং ৪৭ শতাংশ। পুয়ের্তো রিকোর অ্যাসোসিয়েশন অব ফিজিশিয়ান্স অ্যান্ড সার্জনসের সভাপতি ডা. ভিক্টর রামোস করোনা সংক্রান্ত ক্যাম্পেইনে শিশু বয়সে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির ব্যাপারটিকে গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি আত্মবিশ্বাসী যে সামনের দিনগুলোতে পুয়ের্তো রিকোতে আরো বেশি সংখ্যক শিশুকে ভ্যাকসিন দেওয়া সম্ভব হবে। আর এভাবেই পুয়ের্তো রিকো করোনা মোকাবিলায় আমেরিকার জন্য একটি সফল গল্প হয়ে উঠেছে।