ছোট ছোট স্বপ্ন জুড়ে বৃষ্টির ‘ক্ষুদ্র’

বয়স খুব বেশি নয় বৃষ্টির। কিশোরী থেকে সদ্য তরুণীর খাতায় নাম লেখানো একজন তিনি। এখনও তাই চোখ বন্ধ করলে তাজা শৈশব ধরা দেয় চোখের পাতায়। তবে সমবয়সী মেয়েদের থেকে কিছুটা ভিন্ন পরিচয় রয়েছে বৃষ্টির। এই বয়সেই অনলাইন উদ্যোক্তা হিসেবে নিজের পরিচিতি দাঁড় করিয়েছেন এই তরুণী। হ্যান্ডপেইন্টের গয়না ও পোশাকের অনলাইন প্রতিষ্ঠান ‘ক্ষুদ্র’র কর্ণধার বৈশাখী আক্তার বৃষ্টিকে নিয়েই দৈনিক অধিকারের স্বপ্নছুঁই এর আজকের আয়োজন-

জয়পুরহাট জেলার একটি সুন্দর গ্রামে শৈশবের কিছুটা সময় কাটে বৃষ্টির। আড্ডার শুরুতে তাই ছেলেবেলার গল্পই চলে এলো। বৃষ্টি বলেন, আমার শৈশব কেটেছে বেশ আনন্দে। খেলনার বেশির ভাগ অংশ জুড়ে থাকতো আমার মায়ের বানিয়ে দেওয়া খেলনাগুলো। তবে অন্যদের খেলনা আর আমার খেলনার মধ্যে পার্থক্য ছিল। আমি খেলতাম মাটি দিয়ে বানানো খেলনা, কাপড় দিয়ে তৈরি রঙবেরঙের পুতুল দিয়ে। রঙের সঙ্গে আমার সখ্যতা বোধহয় সেখান থেকেই।

উচ্ছল চোখে বৃষ্টি আবার বলতে শুরু করেন, এরপর আমরা যখন ঢাকায় চলে আসলাম তখন আম্মু মাটির বিকল্প হিসেবে বেছে নিলেন মোম। তখনকার সময় মোম জ্বলে নিচে জমা হতো কিছুটা। আর সেই মোম দিয়েই অনেক কিছু তৈরি করা যেত। সেগুলোই ছিল আমার খেলার সঙ্গী। শৈশব বলি আর কৈশোর— পুরোটা জুড়েই রয়েছে আমি, আমার মা, পড়াশোনা আর ক্রাফটিং মানে হস্তশিল্প।

অনলাইনে ব্যবসা শুরু করার গল্প জানতে চাই বৃষ্টির কাছে। তিনি বলেন, যখন থেকে অনলাইন ব্যবসা সম্পর্কে জেনেছি তখন থেকেই ব্যবসা করার ইচ্ছে ছিল। ভেবেছিলাম কজন বন্ধু মিলে শুরু করবো। দুর্ভাগ্যবশত আগ্রহী কাউকেই পাইনি।

যেহেতু হস্তশিল্প আমার শৈশবের সঙ্গী, তাই মাঝেমধ্যেই টুকটাক কাজ করতাম। একদিন মিরর ওয়ার্ক (ছোট টুকরো আয়নার কাজ) করতে ইচ্ছে হলো। আয়না কিনতে দোকানে গিয়ে দেখি সেখানে কাঠের বেজও আছে। তখন কাঠের গয়নার জনপ্রিয়তা খুব বেশি ছিল। স্টুডেন্ট বলে সেই গয়না কেনার সামর্থ্য ছিল না। তো কিছু কাঠের বেজ কিনে আনি। নিজের মতো নকশা এঁকে নিজের জন্য গয়না বানাই। সবাই দেখে বেশ প্রশংসা করে। এর মধ্যে মাথিন নামে এক বান্ধবি অনলাইন ব্যবসার জন্য সাহস দেয়। ওর সাহসেই ফেসবুকে ব্যবসার জন্য পেজ খুলি। সেই থেকে শুরু। ওই সময়টায় মাথিন সাহস না দিলে হয়তো উদ্যোক্তা হিসেবে পরিচয় দিতে আরও কিছুটা সময় লেগে যেত।

২০১৯ সালের এপ্রিল মাসে যাত্রা শুরু করেন বৃষ্টি। শুরুতে কেবল কাঠের বেজে হ্যান্ডপেইন্ট করা গয়না বিক্রি করতেন। ক্রেতার চাহিদায় সে গণ্ডি এখন গিয়ে ঠেকেছে শাড়ি, পাঞ্জাবী, কুর্তিতেও। পোশাক আর গয়নাতে সমানতালে হ্যান্ডপেইন্ট করছেন তিনি। এর পাশাপাশি সুঁই-সুতার মাধ্যমে হ্যান্ড এমব্রয়ডারি করেও গয়না, শিশুদের চুলের ক্লিপ বানাচ্ছেন। নতুন করে সংযোজন করেছেন ফেল্ট আর হলুদের গয়না। নামের সঙ্গে কাজেরও মিল রয়েছে বৃষ্টির ক্ষেত্রে। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশ সংযোগ করে ধীরে ধীরে নিজের উদ্যোগকে সম্পন্ন করছেন এই তরুণী।

অন্যদের তুলনায় ক্রেতারা বৃষ্টির ক্ষুদ্রকে একটু তাড়াতাড়িই গ্রহণ করেছেন, এর পেছনে কারণ কি? জানতে চাইলে বৃষ্টি বলেন, আমার প্রতিটি কাজ আমার নিজ হাতে নিজস্ব ডিজাইনে করা। এছাড়া কিছু ক্ষেত্রে কাস্টমাইজ করার সুযোগও রয়েছে। আমার উদ্যোগে আমি সবসময় চেষ্টা করি নতুন কিছু যোগ করতে আর সর্বোচ্চ কোয়ালিটি নিশ্চিত করতে। অন্যদের চেয়ে ভিন্ন পণ্যের জন্যই মূলত ক্রেতারা আকৃষ্ট হয়। আর রিপিট ক্রেতা পেতে পণ্যের কোয়ালিটি ভূমিকা রাখে বলে আমি মনে করি।

কাজের ক্ষেত্রে পরিবারের তেমন সাহায্য পায়নি বৃষ্টি। বাধাও অত জোরালো ছিল না। হয়তো পরিবার ভেবেছিল এসব করে সময় নষ্ট। তবে নিজের মনোবল শক্ত করে কাজে লেগেছিল তিনি। আর তাই হয়তো এখন অল্প কিছু মানুষ হলেও তাকে উদ্যোক্তা হিসেবে চেনে- এতটুকুই প্রাপ্তি মনে করেন বৃষ্টি।

অনলাইন ব্যবসার ক্ষেত্রে ধৈর্যকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন বৃষ্টি। তিনি মনে করেন, কাজ যা নিয়েই হোক বিক্রেতাকে অবশ্যই ধৈর্যশীল হতে হবে, তবেই মিলবে সফলতা।

ক্ষুদ্রকে নিয়ে কী স্বপ্ন দেখেন বৃষ্টি? জানতে চাই তার কাছে। বৃষ্টি বলেন, ‘আমি যে কাজটা করছি তার ব্যাপ্তি খুব অল্প। আবার হ্যান্ডপেইন্টের কাজ এমন একটি বিষয় যে চাইলেও একসঙ্গে অনেক কাজ করা সম্ভব হয় না। অনেকসময় বাধ্য হয়ে ক্রেতাকে ফিরিয়েও দিতে হয়। ভবিষ্যতে হ্যান্ডপেইন্টের পণ্যের পাশাপাশি কিছু তৈরি পণ্য নিয়েও কাজ করার ইচ্ছে আছে। যেন ক্রেতা যখনই চায় সেগুলো দিতে পারি। আমার ক্ষুদ্রকে অল্প অল্প করে বড় করতে চাই। হয়ত ভবিষ্যতে আমার কাজে সাহায্য করার জন্যও নিব।

বৃষ্টির টুকরো টুকরো স্বপ্ন জুড়ে সৃষ্টি হোক সম্পূর্ণ এক ক্ষুদ্রের। তরুণী এই উদ্যোক্তার জন্য রইল শুভকামনা।