দাবিতেই আটকে আছে বঙ্গবন্ধু হত্যার ‘তদন্ত কমিশন’

বঙ্গবন্ধু হত্যার নেপথ্যের ঘটনা নিয়ে রয়েছে ধোঁয়াশা। আবার কুশীলবদের নিয়েও রয়েছে নানা বিতর্ক। কেউ জিয়াউর রহমানকে দায়ী করেন, কেউ দায়ী করেন জাসদকে। আবার কখনো কখনো নিজ দলের নেতাদেরও দোষারোপ করেন আওয়ামী লীগ নেতারা।

এসব বিতর্কের অবসান ঘটাতে ‘জাতীয় তদন্ত কমিশন’র দাবি দীর্ঘদিনের। এবার আগস্ট মাসে দাবিটি বেশ জোরালো হয়েছিল। পাশাপাশি বঙ্গবন্ধু হত্যার পর কেন আন্দোলন হয়নি, সে কারণও খুঁজতে চেয়েছেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নেতারা। তদন্তের মাধ্যমে সবকিছুরই অবসান সম্ভব বলে মনে করেন রাজনীতিকরা।

এরই মধ্যে তদন্ত কমিশন গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার, এমন তথ্য দিয়েছেন খোদ আইনমন্ত্রী। কিন্তু সে কমিশনের অগ্রগতি কতদূর? নাকি অমীমাংসিতই থেকে যাবে বিষয়টি? এমন প্রশ্ন প্রাসঙ্গিক।

কেন এই কমিশন?
৪৫ বছর পর প্রকৃত ইতিহাসের খোঁজে নেমেছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। দলটির নেতারা বঙ্গবন্ধু হত্যার কুশীলবদের খুঁজে বের করতে চান। ‘বঙ্গবন্ধু হত্যার পর আন্দোলন হয়নি’ এমন অভিযোগের দায় থেকেও মুক্তি চান তারা। তাদের দাবি, সে সময় ডাক আসেনি বলেই প্রতিরোধ গড়ে তোলা যায়নি। এজন্য তখনকার সিনিয়র নেতাদের দায়ী করছেন অনেকে। এছাড়া জাসদকেও দায়ী করে সিনিয়র নেতা শেখ সেলিম বেশ কয়েকবার বক্তব্য দিয়েছেন। পাল্টা জাসদও তার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তবে সবাই চায়, প্রকৃত ইতিহাস উঠে আসুক।

এ বিষয়ে খোদ প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা আগস্টের প্রথম দিনে কৃষকলীগের এক অনুষ্ঠানে বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের খুনিদের আমরা বিচারের আওতায় এনেছি। তবে এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে ষড়যন্ত্রকারীদের উদঘাটন করা হয়নি। একদিন এটিও আবিষ্কার হবে।’

এ নিয়ে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আমির হোসেন আমু   বলেন, বাংলাদেশকে পাকিস্তানের ভাবধারায় ফিরিয়ে নেওয়ার দেশি ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের শিকার বঙ্গবন্ধু। আগামী প্রজন্মের কাছে সেই ষড়যন্ত্রকারীদের মুখোশ উন্মোচন করা প্রয়োজন। সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে নির্মম হত্যাকাণ্ডের নীলনকশা প্রস্তুতকারী ও নেপথ্য নির্দেশদাতাদের বের করতে বিচার বিভাগীয় তদন্ত কিংবা কমিশন গঠন করতে হবে। পাশাপাশি প্রকৃত অপরাধীদের বিচার নিশ্চিত করতে হবে।

অন্যদিকে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম  বলেন, একটা কমিশন গঠন করা হোক, সে কমিশন তদন্ত করুক। দেখবেন এদের সবার নাম বের হয়ে আসবে। একটা বিরাট গ্যাং ছিল, যারা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেছে।

এর আগে জাসদকে দোষারোপ করে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘৭৫’র ১৫ আগস্ট ব্রিগেড কমান্ডারদের কেউ বঙ্গবন্ধুর লাশটা দেখতে যায়নি। সবাই রেডিও স্টেশনে গেছে। সেদিন যারা রেডিও স্টেশনে গেছে তারা সবাই বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। ইনু-তাহের, যারা বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের কথা বলেছিলেন, তারাও গিয়েছিলেন খুনিদের সমর্থন করতে। বঙ্গভবনে গিয়ে তারা খুনি মোশতাককে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন। মোশতাকের সরকারকে তারা অভিনন্দন জানান।

জবাবে জাসদও শেখ সেলিমের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। দলটির সভাপতি হাসানুল হক ইনু ভিন্ন এক অনুষ্ঠানে বলেন, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট আপন মামা বঙ্গবন্ধু ও আপন ভাই শেখ মনির লাশ ফেলে রেখে বঙ্গবন্ধু হত্যাকারীদের সঙ্গে যুক্ত তৎকালীন আমেরিকার দূতাবাসে গিয়ে শেখ সেলিম কী করছিলেন? তা জাতি জানতে চায়।

হাসানুল হক ইনুও এই হত্যাকাণ্ডের পূর্বাপর ঘটনা উদঘাটনে একটি তদন্ত কমিশন গঠনের দাবি জানিয়েছেন।

এদিকে নিজ দলের সমালোচনা বা আত্মসমালোচনা করে এক আলোচনায় আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর কবির নানক বলেন, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট হত্যাকাণ্ডের পর আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের কাছ থেকে প্রতিরোধ বা প্রতিবাদের ডাকা আসেনি। আর প্রতিবাদের ডাক আসেনি বলেই সেই সময় খুনিদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা যায়নি।’

আরেক আলোচনায় আইন বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর আওয়ামী লীগ নেতারা একটি মাত্র ডাকের জন্য অপেক্ষায় ছিলেন, কিন্তু সেই ডাক বা আহ্বান তারা পাননি।’

তিনি বলেন, ষড়যন্ত্রকারীদের চিহ্নিত করতে একটি নিরপেক্ষ কমিশন গঠন করে তার মাধ্যমে আজকের কথাগুলো ফরমালাইজড করে নতুন প্রজন্মের জন্য রেখে যেতে হবে।

কখন এবং কেমন হবে সেই কমিশন?
আগস্ট মাসে এক অনুষ্ঠানে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক সাংবাদিকদের জানান, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ড নিয়ে তদন্ত কমিশন গঠন করা হবে। হত্যাকাণ্ডের পেছনে একটা ষড়যন্ত্র আছে। ষড়যন্ত্রকারীদের চিহ্নিত করে তাদের নাম জনসম্মুখে প্রকাশের সিদ্ধান্ত সরকার এরই মধ্যে নিয়েছে।

তিনি বলেন, করোনাভাইরাসের কারণে আমরা যে রূপরেখাটি তৈরি করেছি, সেটা কিন্তু এখনো জনসম্মুখে আনতে পারিনি এবং সেটার ব্যাপারে আমরা এখনো সিদ্ধান্ত দিতে পারিনি।

‘এই কমিশনের রূপরেখা কী হবে? এই কমিশনের কার্যাবলি কী হবে এবং এই কমিশনটা কাদের দ্বারা গঠিত হবে- এই জিনিসগুলো করোনাভাইরাসের প্রকোপটা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আপনারা দেখতে পাবেন।’

অগ্রগতি কতদূর?
তদন্ত কমিশন গঠনের অগ্রগতি নিয়ে শনিবার (১১ সেপ্টেম্বর) আইনমন্ত্রী আনিসুল হক   বলেন, এটা নিয়ে এখনো কোনো অগ্রগতি নেই। থাকলে আমিই আপনাদের (মিডিয়া) জানাবো।

এর রূপরেখাও আলোচনার পর্যায়ে বলে দাবি তার।

এ নিয়ে সাবেক তথ্যমন্ত্রী ও জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি হাসানুল হক ইনু বলেন, বিতর্ক আর গীবতের অবসান দরকার। তারা (অভিযোগকারীরা) তো এটা বলবে না। আমরা সব সময় বলে আসছি, বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে জাতীয় তদন্ত কমিশন গঠন করে শ্বেতপত্র প্রকাশ করো, সব গীবতের অবসান করো।