ভাইয়ের মরদেহটা পাইলেও মনরে বুঝ দিতে পারতাম

আড়াই মাসের ছোট সন্তানকে ঘরে রেখে বৃহস্পতিবার সজীব গ্রুপের হাশেম ফুড অ্যান্ড বেভারেজ লিমিটেডের কারখানায় কাজে গিয়েছিলেন মোহাম্মদ আলী। এরপর দু’দিন কেটে গেলেও মোহাম্মদ আলীর আর কোনো খোঁজ মেলেনি। মোহাম্মদ আলী যেখানে কাজ করতেন সেখানেই বৃহস্পতিবার বিকেলে ঘটে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা।

ঘটনাস্থল থেকে ৪৮ মরদেহ উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেলের মর্গে নিয়ে আসা হয়। মরদেহগুলো এমনভাবে পুড়ে গেছে চেনার কোনো উপায় নাই। এজন্য মরদেহ শনাক্তে ঢাকা মেডিকেল মর্গ এলাকা থেকে স্বজনদের ডিএনএ নমুনা নেয়া হচ্ছে।

শনিবার (১০ জুন) সকালে ডিএনএ নমুনা দিতে আসেন মোহাম্মদ আলীর বাবা। সঙ্গে ছিলেন মোহাম্মদ আলীর ভাই মিজানুর।

এ সময় ঢাকা মেডিকেল মর্গ এলাকা থেকে মিজানুর বলেন, ‘কারখানায় আগুন লাগার পর আমার ভাইয়ের সঙ্গে মোবাইলে কথা হয়। তখন বলে, ভাই দম আটকে আসছে, নিঃশ্বাস নিতে পারছি না। আমার অক্সিজেন লাগবে।’

‘এরপর আমার ভাই কান্নাকাটি করে বলে, আমারে মাফ করে দিস। আমি আর বাঁচতেছিনে। সবাইরে বলিস আমারে মাফ করে দিতে, আমার জন্য দোয়া করতে। আমার ছেলেটারে দেখে রাখিস।’

মিজানুর বলেন, ‘আমার ভাইয়ের ২ মাস ৯ দিনের একটা বাচ্চা আছে। ওই বাচ্চাকে বাসায় রেখে কাজে গিয়েছিলেন। এখন আমার ভাইয়ের এই ছোট দুধের বাচ্চার কী হবে?’

তিনি বলেন, ‘এখানে এসেছি ভাইয়ের সন্ধানে। আমার বাবার ডিএনএ নমুনা রেখেছে। এখান থেকে বলছে পরীক্ষা করে ২১ দিনের মধ্যে আমাদের জানাবে।’

এসময় কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘ও আমার মেজো ভাই। আমাদের সব শেষ হয়ে গেছে। ভাইকে তো আর পাবো না। ভাইয়ের মরদেহটা যদি পেতাম তাহলে মনকে বুঝ দিতে পারতাম।’

তিনি বলেন, ‘আমার ভাই কারখানার চতুর্থতলায় আটকা পড়েছিল। গেটে তালা দেয়া না থাকলে হয়তো বের হতে পারতো। ওই ফোনে অনেকবার কল করেছি। ঘণ্টাখানেক রিং বেজেছে, এরপর আর ওই ফোনে কল যায় না।’

এদিকে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে সজীব গ্রুপের হাশেম ফুড অ্যান্ড বেভারেজ লিমিটেডের কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ধ্বংসস্তূপ থেকে ৪৮টি মরদেহ উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেলের মর্গে নিয়ে আসা হয়েছে।

এখন এই ৪৮ মরদেহের মধ্যে ১৫টি সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হবে। ৮টি রাখা হবে ঢাকা মেডিকেলের ইমারজেন্সিতে। বাকি ২৫টি মরদেহ থাকবে ঢাকা মেডিকেলের মর্গে। নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ থানার ওসি মশিউর সকালে ঢাকা মেডিকেলের মর্গ এলাকা সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান।

তিনি বলেন, ‘গতকাল মরদেহগুলো সুরতহাল রিপোর্ট ও ময়নাতদন্ত হয়ে গেছে। এখন ডিএনএ শনাক্ত মাধ্যমে মরদেহগুলো স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হবে। সব মরদেহের ডিএনএ শনাক্ত জন্য ডিএনএ নমুনা ঢাকা মেডিকেল মর্গ থেকে নেয়া হবে। আপাতত সবগুলো মরদেহ ফ্রিজিং করে রাখা হবে। ডিএনএ শনাক্ত পর স্বজনদের হস্তান্তর করা হবে।’

গত ৮ জুলাই বিকেলে রূপগঞ্জে সজীব গ্রুপের হাসেম ফুডস লিমিটেডের কারখানায় অগ্নিকাণ্ড ঘটে। ঘটনার প্রথম দিন তিনজনের মৃত্যু হয়। আহত হন অর্ধশত শ্রমিক। ফায়ার সার্ভিসের ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের ১৮টি ইউনিট ২০ ঘণ্টা চেষ্টা চালিয়ে আগুন প্রাথমিকভাবে নিয়ন্ত্রণে আনে। এরপর গত ৯ জুলাই সকালে ওই ভবনের চারতলা থেকে ২৬ নারীসহ ৪৯ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। সব মিলিয়ে এ ঘটনায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৫২ জনে। ২৯ ঘণ্টা পর ৯ জুলাই রাতে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসে আগুন।