বাঁশি বাজালেই মাহাতাবের গায়ে এসে বসে মৌমাছি!

হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার গল্প কে না জানে। তার বাঁশির সুরে গর্ত থেকে বের হয়ে এসেছিল শহরের সব ইঁদুর।

কিন্তু এখন আপনাদের জানাবো অজ পাড়াগাঁয়ের এক বাঁশিওয়ালার গল্প। যার বাঁশির সুরে ঝাঁকে ঝাঁকে বেরিয়ে আসছে মৌমাছি। উড়ে এসে বসছে তার গায়ে। মৌমাছির ভিড়ে দেখা যাচ্ছে না তার শরীর। সে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। আর এই দৃশ্য দেখতে উৎসুক মানুষ ভিড় জমাচ্ছেন যশোরের কেশবপুর উপজেলার মোমিনপুর গ্রামে মাহাতাব মোড়লের বাড়িতে। তার এমন দৃশ্য রীতিমতো অবাক করেছে স্থানীয়দের।
স্থানীয়রা বলছেন, মাহাতাব ছোট বেলা থেকে মধু সংগ্রহ করেন। তবে কিভাবে মৌমাছিকে পোষ মানালেন সেটা সত্যিই অবাক করা। মৌমাছির হুল বসানোর ভয়ে মানুষ ভয়ে পালায়। আর তার বাঁশির সুরে উড়ে চলে আসে তার শরীরে। বিষয়টা সবাইকে অবাক করে অনেকদিন ধরেই।

নাম মাহাতাব মোড়ল হলেও সবাই চেনে মৌমাছি মাহাতাব নামে। যশোরের কেশবপুর উপজেলার হাসানপুর ইউনিয়নের মোমিনপুর গ্রামে তার বাড়ি। তার বাবার নাম মৃত কালাচাঁদ মোড়ল। ছোটবেলা থেকেই মৌচাক থেকে মধু আহরণ করতে শুরু করেন মাহাতাব। ওই সময় বালতিতে শব্দ করে চাক থেকে মৌমাছি দূরে সরিয়ে দেওয়ার কৌশলও রপ্ত করেন তিনি। এরপর টিনের থালায় শব্দ শুনে মৌমাছি চাক ছেড়ে তার কাছে আসতে শুরু করে। কাছে আসার এমন দৃশ্য থেকে মধু সংগ্রহকারী এ পতঙ্গের প্রতি তার ভালোবাসা জন্মায়। সুন্দরবনসহ সাতক্ষীরা, খুলনা ও যশোর অঞ্চলে মৌচাক থেকে মধু সংগ্রহ করেন তিনি। আর এই মধু সংগ্রহ করেই তার স্ত্রী, এক ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে তার সংসার চলে।

মাহাতাব মোড়ল বাংলানিউজকে বলেন, বাবার বাড়ি ছিলো সুন্দরবন-সংলগ্ন কয়রা উপজেলায়। সুন্দরবনসহ সাতক্ষীরা, খুলনা ও যশোর অঞ্চলে তিনি ছোটবেলা থেকে বাবার সঙ্গে মৌচাক থেকে মধু সংগ্রহ করেন। মধুর মৌচাক থেকে মধু সংগ্রহ করতে যেয়ে মৌমাছির প্রতি তার ভালোবাসা জন্মায়। বাড়ির পাশেই একটি মৌমাছির মৌচাক রয়েছে। বাঁশি বাজালে শুরু করলে বাঁশির সুরে হাজারও মৌমাছি এসে বসে। মৌমাছি বসতে বসতে শরীর তার মৌচাকের আকার ধারণ করে। কৌশলগত ওই সুর শুনে এখন হাজারও মৌমাছি তার শরীরে জড়ো হয়। বাঁশি বাজানো বন্ধ করলে মৌমাছি চলে যায়। মৌমাছি শরীরে কামড় দেয় কিনা জানতে চাইলে মাহাতাব বলেন, এর জন্য শরীরকে আগে থেকেই প্রস্তুত করতে হয়। তাদের আঘাত না করলে একটি মৌমাছিও শরীরে হুল বসায় না।

মাহাতাবের মতে মৌমাছি হিংস্রতা দেখালেও তার কাছে মৌমাছির হিংস্র আচরণ কখনই চোখে পড়েনি। ভালোবাসায় সব হিংস্রতা জয় করা সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।
তিনি আরও জানান, ১ বছর ধরে মৌমাছির সঙ্গে কৌশলগত সখ্যতা থাকলেও মৌমাছির সঙ্গে গভীর প্রেম সেই ছোটবেলা থেকেই। এটি কেবল মৌমাছির প্রতি ভালোবাসা থেকেই করা সম্ভব হয়েছে। এতে কোনো অসৎ উপায় ও তন্ত্র-মন্ত্র নেই।

বাড়িতে বাঁশি বাজিয়ে পাঁচ মিনিটেই তিনি শরীরে হাজারও মৌমাছি জড়ো করতে পারেন। কাজটি ঝুঁকিপূর্ণ হলেও অভ্যাস হয়ে যাওয়ায় কোনো ভয় লাগে না বলেও জানান তিনি।

পোকের (মৌমাছি) সঙ্গে বন্ধুত্ব করার দৃঢ় ইচ্ছা থেকেই মাহাতাব মৌমাছিকে কাছে আনতে সক্ষম হয়েছেন। আর প্রথমদিকে খারাপ লাগলেও বিভিন্ন জায়গা থেকে মানুষ একাজ দেখতে আসায় এখন খুশি মাহাতাবের স্ত্রী ফুলজান বেগম।

তিনি বলেন, প্রথমে তার এই কাজ আমি পাগলামি মনে করে অনেক বকা-ঝকা করতাম। নিজের মধ্যে খুব ভয় করতো। জানিনে কখন কি হয়ে যায়। মৌমাছিরা কামড় দিলে তো মারাও যেতে পারে এই ভয়ে। তিনি এখন অসম্ভব জিনিস সম্ভব করেছে। লোকজন এখন তার এই দৃশ্য দেখতে বাড়িতে ভিড় করে সকাল-সন্ধ্যা। আমার খুব ভালো লাগছে।

মাহাতাবের বাড়িতে বাঁশির সুর শুরু করলেই হাজারও মৌমাছি তার শরীরে জড় হয়। এ দৃশ্য দেখার জন্য উৎসুক মানুষ বাড়িতে ভিড় করেন। বাঁশির সুর শুনে ঝাঁকে ঝাঁকে মৌমাছি মাহাতাবের শরীরে বসে চাকের আকার ধারণ করে। বাঁশি বাজানো বন্ধ করার পর মৌমাছি উড়ে পার্শ্ববর্তী বাগানে চলে যায়। মাহাতাবের বাঁশি বাজিয়ে মৌমাছি জড় করা দেখতে দূর-দুরান্ত থেকে ছুটে আসছেন উৎসুক মানুষ। অদ্ভুত এই দৃশ্য দেখে খুশি হয় দর্শনার্থীরা।

পার্শ্ববর্তী ইউনিয়ন থেকে মাহাতাবের এই দৃশ্য দেখতে আসা তোফাজ্জেল হোসেন মানিক বলেন, আমি শুনেছি মাহতাব নাকি বাঁশি বাজিয়ে মৌমাছি নিয়ে আসে। তাই দেখতে এসেছি। এতদিন শুনেছি হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার গল্প; আজ নিজ চোখে দেখলাম মৌমাছির বাঁশিওয়ালা। এখন দেখার পরে বিশ্বাস করছি এই বাঁশিওয়ালার গল্প। এখানে এসে বুঝলাম মানুষ চাইলে অনেক কিছু করতে পারে।

সালাম হোসেন নামে এক প্রতিবেশি জানান, মাহাতাব দীর্ঘদিন ধরে মধু সংগ্রহ করে আসছেন। মধু সংগ্রহের ফলে মৌমাছি সম্পর্কে তার অনেক অভিজ্ঞতা রয়েছে। যার ফলে এই মৌমাছির সঙ্গে বন্ধুত্ব সৃষ্টি করতে পেরেছেন তিনি। বাঁশি বাজিয়ে ঝাঁকে ঝাঁকে মৌমাছি উড়িয়ে তার শরীরে নিয়ে আসে। সরাসরি এই দৃশ্য না দেখলে বিশ্বাস করতে পারবে না কেউ।

মোশাররফ হোসেন নামে এক স্থানীয় স্কুলশিক্ষক বাংলানিউজকে বলেন, মাহাতাব যখন বাঁশির সুর তোলে, তখন সারা শরীরে মৌমাছি উড়ে এসে মাহাতাবের শরীরে জড়ো হয়। দৃশ্যটি দেখেছি। দেখে হতবাক হয়েছি। তবে মাহাতাবের এই কাজের মধ্যে কোনো কৌশল বা লুকোচুরি আছে কিনা বলতে পারবো না। তার এই অভূতপূর্ব দৃশ্য দেখতে দূর-দুরান্ত থেকে লোকজন আসছে।

এ ব্যাপারে কেশবপুর উপজেলার হাসানপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান প্রভাষক জুলমত আলী বাংলানিউজকে বলেন, দীর্ঘদিন মাহাতাব মধু সংগ্রহ করে বেড়ায়। কৌশল আয়ত্ব করে সে বাঁশির সুরে মৌমাছি তার শরীরের আনে শুনেছি। বিভিন্ন স্থান থেকে তার বাড়িতে মানুষও ওই দৃশ্য দেখতে আসছে। তবে, আমি কখনো সরাসরি দেখেনি।

যশোর সরকারি মহিলা কলেজের প্রাণী বিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নার্গিস শিরীন বাংলানিউজকে বলেন, মৌমাছিদের মধ্যে নিজস্ব ভাষা আছে। তারা ঐ ভাষাতেই একে ওপরের সঙ্গে কথা বলে। তবে, বাঁশির সুরে মৌমাছি আকৃষ্ট হয় এটা আমার জানা নেই। এই পর্যন্ত আমার বই প্রস্তুককে এটা পায়নি। বাঁশির সুরে মৌমাছি আকৃষ্ট হয়ে মানুষের গায়ে উড়ে এসে বসে এটার সুযোগ নেই। তবে, মৌমাছিরা তো মধুর ওপর আকৃষ্ট হয়, তাই কেউ যদি তার শরীরে মধু, হরমোনযুক্ত সেন্ট (সুগন্ধি) স্প্রে করে, তখন উড়ে এসে মৌমাছিরা বসতে পারে বলেও জানান তিনি।