প্রতিবেশী রাষ্ট্রে অস্থিরতার প্রভাব দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে

করোনাভাইরাসে (কোভিড-১৯) বিপর্যস্ত ভারত। সামরিক অভ্যুত্থানের পর উত্তপ্ত মিয়ানমার। প্রতিবেশী দুই দেশে এমন অস্থিরতার প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশেও। বিশেষ করে আমদানি-রফতানি জটিলতায় দেশ দুটির সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্যে ভাটা পড়েছে, যা হয়ে উঠছে বড় উদ্বেগের কারণ।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, প্রতিবেশী এ দুই দেশ থেকে বাংলাদেশ যেমন পণ্য আমদানি করছে, তেমনি রফতানিও করছে। বিশেষ করে ভারত থেকে খাদ্যসহ বেশকিছু পণ্য আমদানি করে বাংলাদেশ, যেসবের জোগানে ইতোমধ্যে টান পড়েছে। অন্যদিকে দেশটিতে খাদ্যপণ্য, পোশাক, প্লাস্টিকসহ বেশকিছু পণ্য রফতানি হয়, সেই কার্যক্রমেও পড়েছে ভাটা।

আমরা এক লাখ টন চালের চুক্তি করার দু-তিনদিন পরই মিয়ানমারে অভ্যুত্থান হলো। এরপর চাল পাওয়া অনিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল। যদিও সে চাল আমরা এখন পাচ্ছি। এতোদিনে ২০ হাজার ৬০০ টন পেয়েছি। এখনো পর্যায়ক্রমে দিচ্ছে

এ বিষয়ে কথা হচ্ছিল পুরান ঢাকার শ্যামবাজারের মসলা পণ্যের অন্যতম আমদানিকারক আবদুল মাজেদের সঙ্গে। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘এখন ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানি বন্ধ রয়েছে। ব্যবসা হচ্ছে না। মসলার অনেক ব্যবসায়ী ভারতনির্ভর ব্যবসা করেন।’

তিনি বলেন, ‘সুখের বিষয় হলো—দেশি পেঁয়াজের মৌসুম চলছে, পর্যাপ্ত সরবরাহের কারণে সেটার কোনো প্রভাব মানুষ বুঝতেই পারছে না। কিন্তু এ পরিস্থিতি যদি আরও দু-তিন মাস চলে, তবে পেঁয়াজের দর ক্রমাগত বাড়তে থাকবে। কারণ দেশি পেঁয়াজের মজুত ফুরিয়ে আসবে।’

মিয়ানমারও বাংলাদেশের পেঁয়াজ-আমদানির অন্যতম বড় বাজার উল্লেখ করে আবদুল মাজেদ বলেন, ‘উত্তপ্ত পরিস্থিতির কারণে মিয়ানমারের বাজারও বন্ধ প্রায়। সব মিলিয়ে মসলার বাজারে সামনের সময় ভালো মনে হচ্ছে না।’

জানা গেছে, ভারত থেকে বিভিন্ন পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে যে ইমপোর্ট পারমিট (আইপি) লাগে, তা ইস্যু করা আপাতত বন্ধ রেখেছে সরকার। এ কারণে দেশের স্থলবন্দর দিয়ে ভারতীয় পণ্য আমদানি বন্ধ হয়ে গেছে। নতুন আইপি না দেয়া পর্যন্ত ভারত থেকে পণ্য আমদানি করা সম্ভব হবে না।

ভারতে লকডাউনের কারণে দোকানপাট বন্ধ রয়েছে। এছাড়া বর্ডারও বন্ধ (জনচলাচল)। সব মিলিয়ে ভারতের সঙ্গে পোশাকের ব্যবসা বন্ধ হয়ে গেছে

বাজারে এর তেমন প্রভাব পড়েছে কি-না জানতে চাইলে রাজধানীর সবচেয়ে বড় ভোগ্যপণ্যের বাজার মৌলভীবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক গোলাম মাওলা জাগো নিউজকে বলেন, ‘এমন পরিস্থিতির প্রভাব হুট করেই বোঝা সম্ভব নয়। তবে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে যেহেতু আমাদের নানা ধরনের ভোগ্যপণ্যের ব্যবসা রয়েছে, সেক্ষেত্রে অস্থিতিশীলতা যত দীর্ঘ হবে প্রভাবও তত বাড়বে।’

এদিকে চাল আমদানির ক্ষেত্রে মিয়ানমারের সামরিক অভ্যুত্থান বড় প্রভাব ফেলছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, আমদানির সুযোগ থাকার পরও সে দেশ থেকে অস্থিতিশীলতার কারণে চাল আমদানি করতে পারেননি ব্যবসায়ীরা। অনেকে ওই সময় এলসি খুলে এখনো চাল পাননি।

এমনকি মিয়ারমারের অভ্যুত্থানের আগে দুই দেশের সরকারের মধ্যে একটি চুক্তি হয়েছিল, যার মাধ্যমে বাংলাদেশে এক লাখ টন চাল আনার কথা হয়েছিল। রফতানির ওই চাল এখনো পুরোপুরি আসেনি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে খাদ্য সচিব মোছাম্মৎ নাজমানারা খানুম জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমরা এক লাখ টন চালের চুক্তি করার দু-তিনদিন পরই মিয়ানমারে অভ্যুত্থান হলো। এরপর চাল পাওয়া অনিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল।’

এমন পরিস্থিতির প্রভাব হুট করেই বোঝা সম্ভব নয়। তবে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে যেহেতু আমাদের নানা ধরনের ভোগ্যপণ্যের ব্যবসা রয়েছে, সেক্ষেত্রে অস্থিতিশীলতা যত দীর্ঘ হবে প্রভাবও তত বাড়বে

তিনি বলেন, ‘যদিও সে চাল আমরা এখন পাচ্ছি। এতোদিনে ২০ হাজার ৬০০ টন পেয়েছি। এখনো পর্যায়ক্রমে দিচ্ছে। যারা আমাদের চাল সরবরাহ করছে, তারা বলছে— মিয়ানমারের সামরিক সরকার তাদের সহযোগিতা করছে না। তাই ছোট ছোট চালানে চাল দিচ্ছে।’

দেশে পণ্যের ঘাটতি হলে সবচেয়ে বেশি ভুগতে হয় চাল আর পেঁয়াজ নিয়েই। বিগত সময়ে ভারত পেঁয়াজ বন্ধ করে দেয়ার পর দেশে পেঁয়াজের দাম ২০০ টাকা ছাড়িয়ে যায়। আমদানিতে বাধ্যবাধতার কারণে দেশে এখনো চালের দাম সর্বোচ্চ। এমন পরিস্থিতিতে এ বছরও সরকারি-বেসরকারি যে চাল আমদানি হয়েছে, তার ৯৫ শতাংশ ভারত ও মিয়ানমারের।

মিয়ানমার থেকে এক লাখ টন চাল আমদানির চুক্তি হওয়ার কয়েকদিন পরই সামরিক অভ্যুত্থান হয়

বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, দেশে আমদানি পণ্যের মধ্যে সর্বোচ্চ আসে চীন থেকে, যা মোট আমদানির ২৬ শতাংশের বেশি। তারপরই তালিকায় রয়েছে ভারত, সে দেশ থেকে আসে মোট আমদানির প্রায় ১৫ শতাংশ। বিশেষ করে মসলা, দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্য, মরিচ, গম, চাল, মসুর ডাল এবং পেঁয়াজের সিংহভাগ আসে ভারত থেকে।

রফতানিতে বড় বাধা
ভারতে বাংলাদেশি পণ্যের প্রায় দেড়শ কোটি ডলারের বাজার রয়েছে। বাংলাদেশি পণ্য রফতানিতে শীর্ষ ১০ দেশের মধ্যে রয়েছে ভারত।

রফতানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবির) তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ভারতে তৈরি পোশাক, সয়াবিন তেল ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্য রফতানি হচ্ছে বেশি। এছাড়া প্লাস্টিক পণ্য, ইস্পাত, চামড়াজাত পণ্য, সয়াবিন তেল, পাট ও পাটের সুতা, মাছ ইত্যাদি পণ্যও রফতানি হচ্ছে।

বিগত সময়ে ভারত পেঁয়াজ বন্ধ করে দেয়ার পর দেশে এ পণ্যের দাম ২০০ টাকা ছাড়িয়ে যায়

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত কয়েক বছরে ভারতের বিভিন্ন শহরে পোশাকের বিদেশি অনেক নামি দামি ব্র্যান্ড বিক্রয় কেন্দ্র খুলেছে। তাতে বাংলাদেশি পোশাক রফতানিও দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া প্লাস্টিক ও খাদ্যপণ্যের বিক্রি ভালো চলছিল। করোনা পরিস্থিতিতে ভারতে পণ্য রফতানি কমে যাচ্ছে।

জানতে চাইলে তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘ভারতে লকডাউনের কারণে দোকানপাট বন্ধ। এছাড়া বর্ডারও বন্ধ (জনচলাচল বন্ধ)। সব মিলিয়ে ভারতের সঙ্গে পোশাকের ব্যবসা বন্ধ হয়ে গেছে।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২০-২১ অর্থবছরের জুলাই-মার্চ বৈদেশিক লেনদেনের চলতি হিসাবে ভারসাম্যের (ব্যালেন্স অব পেমেন্ট) ওপর করা হালনাগাদ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে ইপিজেডসহ রফতানি খাতে সরকার আয় করেছে দুই হাজার ৮৭২ কোটি ডলার। এর বিপরীতে আমদানি বাবদ ব্যয় করেছে চার হাজার ২৭৬ কোটি ডলার। সে হিসাবে ৯ মাসে বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৪৪৯ কোটি ৭০ লাখ ডলার। দেশীয় মুদ্রায় ঘাটতির এ পরিমাণ এক লাখ ২৩ হাজার ৯৩৫ কোটি টাকা (প্রতি ডলার ৮৪ টাকা ৮০ পয়সা ধরে)।