জলাবদ্ধতা নিয়ে আশা দেখাচ্ছে দুই সিটি করপোরেশন

নিজস্ব প্রতিবেদক: বৃষ্টি হলেই ডুবে যায় রাজধানী। কোথাও হাঁটুপানি, কোথাও কোমরপানি। টানা কিছুক্ষণ বৃষ্টি হলেই সড়কসহ ডুবে যায় শহরের বড় অংশ। যে কারণে প্রতিবছর জলাবদ্ধতার ভোগান্তি পোহাতে হয় ঢাকাবাসীকে। এই জলাবদ্ধতার মূল কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে খালগুলো অবৈধ দখলে থাকা, পানি প্রবাহ ঠিক না থাকা ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কার্যত পরিকল্পনা না থাকা।

কিন্তু অন্যান্যবারের তুলনায় এ বছর জলাবদ্ধতা অনেকাংশেই কম হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ শেষে রাজধানীতে আর আগের মত জলাবদ্ধতা থাকবে না বলে নগরবাসীকে আশা দেখাচ্ছে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন।

জানা গেছে, ঢাকা মহানগরীতে প্রধান ড্রেন লাইনগুলো নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব ছিল ঢাকা ওয়াসার। আর শাখা লাইনগুলোর দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের ওপর ন্যস্ত ছিল। ওই সময় রাজধানীর মোট ড্রেনেজ লাইনের মধ্যে ৩৮৫ কিলোমিটার ঢাকা ওয়াসার অধীনে ও প্রায় ২ হাজার ৫০০ কিলোমিটার ঢাকা সিটি করপোরেশনের অধীনে ছিল। এর বাইরে ৭৪ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের ২৬টি খাল ও ১০ কিলোমিটার বক্স কালভার্টের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বও ছিল ঢাকা ওয়াসার। যে কারণে বর্ষায় সৃষ্ট জলাবদ্ধতা নিরসনে সংস্থাগুলো একে অন্যের ওপর দায় চাপিয়ে আসছিল।

কিন্তু গত ৩১ ডিসেম্বর থেকে ওয়াসার দায়িত্বে থাকা সব নালা ও খাল দুই সিটি করপোরেশনের কাছে হস্তান্তর করা হয়। ১৯৬৩ সাল পর্যন্ত নগরীর ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরের হাতে ছিল। এরপর পৌরসভা এ দায়িত্ব পালন করত। ১৯৮৮ সালে এটি ঢাকা ওয়াসাকে হস্তান্তর করা হয়।

ওয়াসার দায়িত্বে থাকা সব নালা ও খাল দুই সিটি করপোরেশনের কাছে হস্তান্তরের পর সেগুলো দখলমুক্ত করে ঢেলে সাজানোর কাজ শুরু করা হয়। করপোরেশনগুলো এসব খালের বর্জ্য অপসারণ ও দখল মুক্ত করে স্বচ্ছ পানি প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে কাজ করছে। গত ৩১ ডিসেম্বর থেকে দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকেই এ বিষয়ে কাজ করে যাচ্ছে দুই সিটি করপোরেশন।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) সূত্রে জানা গেছে, খালের দায়িত্ব পাওয়ার পর ডিএসসিসি গত ২ জানুয়ারি থেকে চলতি মাস পর্যন্ত দুটি বক্স কালভার্ট ও চারটি খালের বর্জ্য ও পলি অপসারণ কার্যক্রম পরিচালনা করে। একইসঙ্গে সেসব খালের সীমানা নির্ধারণ ও অবৈধ দখলে থাকা জায়গা পুনরুদ্ধারের কাজ পরিচালিত হয়। জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত তারা নিজস্ব অর্থায়নেই সেসব খাল ও বক্স কালভার্ট পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, অবৈধ দখল উচ্ছেদ ও খনন কাজ শেষ করেছে। খাল ও বক্স কালভার্টগুলো থেকে তারা ১০ লাখ টনের বেশি পলি ও বর্জ্য অপসারণ করেছে। এতে খাল ও বক্সকালভার্টগুলোতে দৃশ্যমানভাবে পানি প্রবাহ বৃদ্ধি পেয়েছে বলে দাবি ডিএসসিসির।

এছাড়া ওয়াসার কাছ থেকে পাওয়া কমলাপুর ও ধোলাইখাল পাম্প স্টেশনের ছয়টি পাম্প মেশিনের মধ্যে কমলাপুরের একটি ও ধোলাইখালের দুটি পাম্প মেশিন সচল করেছে করপোরেশন। বাকি তিনটি পাম্প মেশিন সচল করার কার্যক্রম চলমান রেখেছে। একইসঙ্গে ৩০টি ভ্রাম্যমাণ পাম্প মেশিন ক্রয় প্রক্রিয়া সম্পাদনের কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে বলে জানা গেছে। অন্যদিকে আগামী মাসের ২০ তারিখের মধ্যে করপোরেশনের ৭১৫ কিলোমিটার ও ওয়াসার কাছ থেকে পাওয়া ১৮৫ কিলোমিটার বদ্ধ নর্দমার মুখ পরিষ্কার কার্যক্রম সম্পন্ন করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে দিয়েছে ডিএসসিসি।

ডিএসসিসির মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস এলাকায় জলাবদ্ধতা নিরসনের এসব কাজের কথা উল্লেখ করে বলেন, জলাবদ্ধতা এই নগরীর দীর্ঘদিনের পুঞ্জিভূত এক মানবিক সমস্যা। সামান্য বৃষ্টিতেই আমাদের প্রিয় এই নগরী পানির নিচে তলিয়ে যেত। কিন্তু কেউ কখনো এই সমস্যার গভীরে যায়নি। খালের দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকে আমরা নিরলসভাবে কাজ করে চলেছি। আমাদের সার্বিক কর্মকাণ্ডের ফলে এই বর্ষায় আমরা ঢাকাবাসীকে জলাবদ্ধতার কবল হতে বহুলাংশে মুক্তি দিতে পারব বলে আমি আশাবাদী।

অন্যদিকে দায়িত্ব নেওয়ায়র পর থেকে এ পর্যন্ত ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) আওতায় স্কেভেটর ব্যবহার করে খাল থেকে ১১ হাজার ৬৩৮ টন ভাসমান বর্জ্য অপসারণ করা হয়েছে। খালের তলদেশ থেকে অপসারণ করা হয়েছে ৫ হাজার ৮০০ টন কঠিন বর্জ্য। বর্তমানে খালগুলোতে পানি প্রবাহ সচল রয়েছে। পানি প্রবাহ আরও বৃদ্ধির জন্য ইতোমধ্যে দুটি ফ্লোটিং টাইপ স্কেভেটর ভাড়ার মাধ্যমে ব্যবহৃত হচ্ছে। এছাড়া মোট ২১ হাজার ৮৪৩ জন পরিচ্ছন্নতাকর্মী খাল পরিষ্কারে কাজ করছেন। পাশাপাশি ঢাকা ওয়াসা থেকে পাওয়া ১৮০ কিলোমিটার স্ট্রর্ম স্যুয়ারেজ ড্রেনের মধ্যে ৯৪.৭১ কিলোমিটার ড্রেন পরিষ্কারের জন্য ৩৩ কোটি টাকা ব্যয়ে পাঁচটি আঞ্চলিক কার্যক্রম গ্রহণ করেছে।

অন্যদিকে ডিএনসিসি এলাকায় জলাবদ্ধতা নিরসনে স্বল্পমেয়াদী পরিকল্পনা হিসেবে মগবাজার, মধুবাগ, কারওয়ান বাজার, উত্তরা ১ নম্বর সেক্টরসহ এয়ারপোর্ট রোডে বনানী রেলগেট থেকে কাকলী মোড় পর্যন্ত ড্রেন নির্মাণ ও পাইপলাইন স্থাপন করেছে। এছাড়া ইব্রাহিমপুর খাল, কল্যাণপুর খাল, আব্দুল্লাহপুর খিজির খালের অবৈধ দখল থেকে উদ্ধার করেছে ডিএনসিসি।

গত ১৫ মে দায়িত্ব গ্রহণের এক বছর পূর্তি উপলক্ষে এসব তথ্য জানিয়েছেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, অবৈধভাবে জায়গা ও খাল দখল করে যারা রেখেছেন আমি তাদের কোনো নোটিশ করব না। অবৈধ দখলদারদের কোনো নোটিশ নয়, আমি যাবো এবং ভাঙব। কেউ দখল করে যদি কোনো কিছু নির্মাণ করে রাখেন তাহলে তারা খুব বড় ভুল করছেন।

এদিকে খাল ও ড্রেনগুলো পরিষ্কার, দখলমুক্ত ও সংযোগ তৈরি করে টেকসই প্রবাহ নিশ্চিতের লক্ষ্যে কাজ শুরু হয়েছে জানিয়ে ডিএনসিসির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এটা বছরজুড়ে চলমান থাকবে। এসব কার্যক্রমের ফলে ডিএনসিসি অনেকটা আশাবাদী, এবারের বর্ষায় জলাবদ্ধতা অনেকাংশে কম হবে।

খাল উদ্ধার করে এর পানি প্রবাহ ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি নান্দনিকতায় খালের রূপ বদলে দিতে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করে কাজ করেছে ডিএনসিসি। জানা গেছে, সাগুফতা খাল, রামচন্দ্রপুর খাল, ইব্রাহিমপুর খাল, গোদাগারি খাল, রূপনগর খালসহ ১৪টি খাল থেকে প্রথম দুই মাসে ৯ হাজার ৩০০ টন বর্জ্য অপসারণ করে ডিএনসিসি। চারটি নদীর সঙ্গে এগুলোর সংযোগ স্থাপন করতে চায় ডিএনসিসি। এছাড়া হাতিরঝিল থেকে কালাচাঁদপুর, বনানী কবরস্থান, কড়াইল বস্তিতে যেন নৌপথে যাওয়া যায় সেই ব্যবস্থার পাশাপাশি কয়েকটি ব্রিজ উঁচু করার জন্য প্রকল্প গ্রহণ করেছে তারা। যা স্থানীয় সরকার বিভাগে প্রক্রিয়াধীন বলে জানা গেছে।

অন্যদিকে জলাবদ্ধতা নিরসনে বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনে ঢাকা ওয়াসার থেকে দুই সিটি করপোরেশনকে দায়িত্ব দেওয়ার পর ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের অধিভূক্ত খাল, কালভার্ট, স্ট্রর্ম ওয়াটার ড্রেন ব্যবস্থাপনা ও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনায় বিভিন্ন কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি সমন্বয় সেল গঠন করেছে ডিএনসিসি।

ইতোমধ্যে ঢাকা ওয়াসার কাছ থেকে ২৬টি খাল দুই সিটি করপোরেশনের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এর বাইরে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়, রাজউক ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের অধীনে থাকা রাজধানীর ১৭টি খাল রয়েছে। এই খাল ও জলাশয়গুলো দুই সিটি করপোরেশনের কাছে হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

গত ১৮ মে জলাবদ্ধতা নিরসনে ঢাকা মহানগরীর খাল ও প্রাকৃতিক জলাশয় সংরক্ষণ এবং রক্ষণাবেক্ষণ বিষয়ক আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় এ কথা জানান স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম।

তিনি বলেন, হস্তান্তর প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য স্থানীয় সরকার বিভাগের সিনিয়র সচিব হেলালুদ্দীন আহমদকে আহ্বায়ক করে সংশ্লিষ্ট সব বিভাগ, সংস্থা ও দপ্তরের প্রতিনিধি নিয়ে একটি ওয়ার্কিং কমিটি গঠন করা হবে। এই কমিটি আগামী এক সপ্তাহের মধ্যেই রিপোর্ট প্রদান করবে। রিপোর্ট অনুযায়ী হস্তান্তর প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে।