যে কারণে সুন্দরবনে আগুন লাগে…

কিছুতেই বিপদ পিছু ছাড়ছে না বাংলাদেশের জীববৈচিত্র্যের সবচেয়ে বড় আধার সুন্দরবনের। ঝড়-জলোচ্ছ্বাস থেকে বুক পেতে দিয়ে যে সুন্দরবন উপকূলকে আগলে রাখে বারবার কেন তাকে আগুনে পুড়তে হয়? নেপথ্যের রহস্যটা কী? দক্ষিণাঞ্চলের সুরক্ষা দেওয়াল সুন্দরবন বিগত দুই দশকে অন্তত ২৪ বার আগুনের লেলিহান শিখায় পুড়েছে।

৩ মে (সোমবার) পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জের দাসের ভারানি এলাকায় আগুন লাগে। ফায়ার সার্ভিস, বন বিভাগ ও স্থানীয়দের প্রায় ৩০ ঘণ্টার প্রচেষ্টায় মঙ্গলবার (৪ মে) বিকেল ৫টায় আগুন নিভে যায়। পরবর্তীসময়ে বুধবার (৫ মে) সকালে আগের অগ্নিকাণ্ডের দক্ষিণ পাশে আবারও আগুন লাগে।

প্রতিবার আগুন লাগার কারণ অনুসন্ধান, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করতে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। সেসব কমিটি আগুন লাগার কারণ তুলে ধরে তা বন্ধে কী কী করতে হবে, তার তালিকাও দিয়েছে। তবে দীর্ঘদিনেও সেসব সুপারিশ বাস্তবায়িত হয়নি।

সুপারিশগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- ৪০ কিলোমিটার খাল ও তিনটি পুকুর পুনঃখনন, আগুন লাগলে তা নিয়ন্ত্রণে বন বিভাগের জনবল বাড়ানো, বনরক্ষীদের টহল কার্যক্রম জোরদার, তিনটি পর্যবেক্ষণ টাওয়ার তৈরি, সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জের ৩৫ কিলোমিটার এলাকায় নাইলনের দড়ি দিয়ে বেড়া নির্মাণ, রিভার ফায়ার স্টেশন নির্মাণ ও বনসংলগ্ন ভরাট হয়ে যাওয়া ভোলা নদী।

কেন সুন্দরবনে বারবার আগুন লাগে- এ বিষয়ে বিভিন্ন অনুসন্ধান থেকে জানা যায়, জেলে-বাওয়ালদের ফেলে দেওয়া বিড়ি-সিগারেটের আগুন থেকে সুন্দরবনে অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত ঘটে। যে এলাকাগুলোতে বারবার আগুন লাগছে, সেখানকার নদী-খাল ভরাট হয়ে যাওয়ায় স্থানীয় লোকজন সহজেই বনের মধ্যে ঢুকতে পারছে। অনেক সময় তাদের বিড়ি-সিগারেটের উচ্ছিষ্টাংশ থেকে আগুন লাগছে।

মধু সংগ্রহের পর মৌয়ালদের ফেলে দেওয়া মশাল থেকেও আগুন লাগে। মাছ ধরার সুবিধার্থেও বেশ কয়েকবার আগুন লাগিয়েছে স্থানীয় একটি চক্র। আগুন লাগিয়ে দেওয়ার ঘটনায় একাধিক মামলাও হয়েছে। কিন্তু ঘটনাগুলোর সঙ্গে জড়িতদের বেশিরভাগই ধরা পড়েনি। আবার যারা ধরা পড়েছে তারা আইনের ফাঁক দিয়ে ছাড়া পেয়ে গেছেন।

সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ২০০২ সালে সুন্দরবনের পূর্ব বিভাগের চাঁদপাই রেঞ্জের কটকায় একবার, একই রেঞ্জের নাংলী ও মান্দারবাড়িয়ায় দু’বার, ২০০৫ সালে পচাকোড়ালিয়া, ঘুটাবাড়িয়ার সুতার খাল এলাকায় দু’বার, ২০০৬ সালে তেড়াবেকা, আমুরবুনিয়া, খুরাবাড়িয়া, পচাকোড়ালিয়া ও ধানসাগর এলাকায় পাঁচবার, ২০০৭ সালে পচাকোড়ালিয়া, নাংলি ও ডুমুরিয়ায় তিনবার, ২০১০ সালে গুলিশাখালীতে একবার, ২০১১ সালে নাংলীতে দু’বার, ২০১৪ সালে গুলিশাখালীতে একবার, ২০১৬ সালে নাংলী, পচাকোড়ালিয়া ও তুলাতলায় তিনবার, ২০১৭ সালে মাদ্রাসারছিলায় একবার এবং সবশেষ চলতি বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি ধানসাগর এলাকায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। সুন্দরবনের সবক’টি আগুনের ঘটনাই শুষ্ক মৌসুমে।

বন সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দা ও বনজীবীদের মতে, আগুন লাগার ঘটনার সংখ্যা ৩০। আগুনে পুড়ে গেছে কমপক্ষে ৭০-৭৫ একর বনভূমির গাছপালা।

অভিযোগ রয়েছে, বনসংলগ্ন এলাকায় রিভার ফায়ার স্টেশন না থাকায় আগুন নেভাতে অনেক সময় লেগে যায়। এছাড়া আগুন প্রতিরোধে বন বিভাগের উদাসীনতা রয়েছে।

সুন্দরবন একাডেমির নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আনোয়ারুল কাদির বাংলানিউজকে বলেন, শরণখোলা রেঞ্জে আগুন লাগে বেশি। মাছ মারার জন্য আগুন লাগানো হয়। প্রাকৃতিকভাবে আগুন সুন্দরবনে লাগে না। বনে যারা গমন করে তারাই এই কাজটি করে তাদের স্বার্থের জন্য। দমকল আনলে তো আগুন লাগলে নেভানো যাবে, কিন্তু কী করলে আগুন লাগবে না সেটাই আগে করতে হবে। যারা সুন্দরবনে মাছ ধরতে যায় তাদের একটি চক্র পরিকল্পিতভাবে বনে আগুন লাগায়। তাদের এ চক্রটি ভেঙে দিতে হবে। বনবিভাগ ও ওই এলাকার স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও জানে কারা আগুন লাগায়।

অপরাধীদের দৌরাত্ম্য রোধে নিরাপত্তাচৌকির মাধ্যমে নজরদারি বাড়ানোর দাবি জানান সুন্দরবন বিষয়ক এ গবেষক।

সুন্দরবন গরেষক খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেস্ট্রি অ্যান্ড উড টেকনোলজি ডিসিপ্লিনের প্রফেসর ড. মো. এনামুল কবির বাংলানিউজকে বলেন, সুন্দরবনে আগুন লাগার প্রাকৃতিক কোনো কারণ নেই। বিশ্বের অন্য বনে প্রাকৃতিকভাবে আগুন লাগে। সেটা হচ্ছে প্রচণ্ড খরার উত্তাপে শুকনা কাঠে ঘসা লেগে আগুন জ্বলে। আমেরিকার ক্যালেফর্নিয়ায় প্রচুর ফরেস্ট ফায়ার হয়। সুন্দরবনে আগুন লাগার প্রাকৃতিক কোনো কারণ আমাদের জানা নেই। এটা সাধারণত মানুষের সৃষ্ট আগুন। এবার আগুন লেগেছে কী কারণে তা তদন্তের বিষয়। আপনি নিশ্চিত ধরে নিতে পারেন এটা মানুষসৃষ্ট। কারা কী কারণে করেছে তা অবশ্য এই মুহূর্তে কেউ বলতে পারছে না।

সম্প্রতি সুন্দরবনের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পর গঠিত তদন্ত কমিটিকে সাতদিনের মধ্যে রিপোর্ট দিতে বলা হয়। সেই সাতদিন অতিবাহিত হওয়ার পর রিপোর্ট কী হয়েছে জানতে চাইলে সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. বেলায়েত হোসেন বাংলানিউজকে বলেন, এখনো কোনো রিপোর্ট দেয়নি। সাতদিন সময় বাড়ানোর জন্য আবেদন করেছে।

আগের দুই ডজন তদন্ত কমিটির সুপারিশ কতটা বাস্তবায়ন হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সব তদন্ত কমিটির কমন কথা হলো খাল খনন করা, ওয়াচ টাওয়ার নির্মাণ করা। আমাদের খাল খননের একটা প্রজেক্ট পাস হয়েছে। পুরোপুরি নয়, আংশিক। জয়মনি থেকে নাঙ্গলি পর্যন্ত প্রজেক্ট পাস হয়েছে। আর কাটা তার ও ওয়াচ টাওয়ারের ব্যাপারে প্রজেক্ট লাইনে রয়েছে।

এদিকে, সম্প্রতি দুই দফায় অগ্নিকাণ্ডের পর শনিবার (৮ মে) বিকেলে সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের শরণখোলা রেঞ্জের দাসের ভারানি এলাকার আগুন লাগা স্থান পরিদর্শন করেন পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব কবির বিন আনোয়ার।

এসময় তিনি বলেন, সুন্দরবন রক্ষায় সরকার সব সময় বদ্ধপরিকর। বিভিন্ন সময় সুন্দরবন রক্ষায় সরকার নানা উদ্যোগ নিয়েছে। সম্প্রতি সুন্দরবনের মধ্যে যে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে এটা নিশ্চয়ই উদ্বেগের কারণ। ভবিষ্যতে সুন্দরবনে অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধে আসছে শুষ্ক মৌসুমের আগেই সুন্দরবনের লোকালয় সংলগ্ন নদী, খাল পুনঃখনন করা হবে।

তিনি আরও বলেন, বর্তমান সরকার ইতোমধ্যে সুন্দরবন ও মোংলা এলাকায় ৮৩টি নদী, খাল পুনঃখনন করেছেন। যা এই এলাকার জীববৈচিত্র্য রক্ষায় কাজ করছে। বিভিন্ন সময় সুন্দরবনের চারপাশে যে কাঁটাতারের বেড়া ও ওয়াচ টাওয়ার নির্মাণের কথা হয়েছে তাও বাস্তবায়ন করা হবে।

সুন্দরবন রক্ষায় বন বিভাগকে আরও সতর্ক এবং স্থানীয় জনগণ ও বনজীবীদের আরও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।