সাগরপাড়ের সেই মেয়েটি এখন উপপুলিশ পরিদর্শক

লেখক: তানিম টিভি
প্রকাশ: ৯ মাস আগে

অল্প অল্প করে যখন বুঝতে শিখেছি, তখন আমার পরিবারে বেশ আর্থিক দৈন্যতা ছিল। কৃষক বাবার ঘরে তখন ‘নুন আনতে পান্তা ফুরায়’ অবস্থা। এ অবস্থার মধ্যে আমাকে ধর্মীয় শিক্ষায় কিছুটা শিক্ষিত করার প্রয়াসে বাবা পাড়ার এক প্রান্তে থাকা ঠাকুরবাড়িতে নিয়ে ভর্তি করলেন। এর পর থেকে প্রতিদিন সকালে পাড়ার অন্যান্য ছেলেমেয়ের সঙ্গে ঠাকুরবাড়ি যাই। শুরু হলো আমার পাঠশালা জীবন।

এ গল্প কুয়াকাটার কালাচাঁনপাড়ার ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী রাখাইন কন্যা ম্যান মের। অদম্য প্রত্যয়ী ম্যান মে এখন বাংলাদেশ পুলিশের এক গর্বিত উপপুলিশ পরিদর্শক।

ম্যান মে যুগান্তরের সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় জানান, তাকে নিয়ে তার পরিবার বেশিদূর যাওয়ার স্বপ্ন দেখেননি। তার পড়ালেখায় মনোযোগ এবং মেধার প্রতি লক্ষ্য রেখে কালাচাঁনপাড়ার শাসনাসুখাকারী বৌদ্ধবিহারের বিচক্ষণ ধর্মযাজক প্রয়াত উচেনা মহাথেরো ভিক্ষু বাংলা-ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তোলার কথা প্রথমে ভাবেন।

এখানকার আদিবাসী রাখাইন ছেলেমেয়েদের নিজস্ব ভাষায় উচ্চশিক্ষা লাভের সুযোগ নেই। ফলে তিনি ম্যান মেকে পাড়ার নিকটবর্তী ১১৭নং আমজেদপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি করেন। প্রাথমিক পর্যায়ে পড়ালেখায় বিশেষ কোনো ব্যয় না থাকায় পরিবার থেকে তখন আপত্তি তোলা হয়নি।

ওই বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মো. সুলতান মাহমুদ বলেন, ম্যান মে একজন মেধাবী ছাত্রী হওয়ার পাশাপাশি খুবই বুদ্ধিমতি এবং মার্জিত স্বভাবের ছিলেন। পড়ার প্রতি তার বিপুল আগ্রহ ছিল। অদম্য ইচ্ছাই তাকে প্রতিষ্ঠা দিয়েছে।

ম্যান মে বলেন, কালাচাঁনপাড়া থেকে গৃহিণী মা অংমাউ প্রতিদিন আমজেদপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পৌঁছে দিতেন। বর্ষা কিংবা দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া কোনোটাই নিয়মিত স্কুলে যাওয়ার ক্ষেত্রে আমার বাধা হতে পারেনি।

তিনি জানান, তার পড়ালেখায় শুরুতে বাবা চিংমং রাখাইনের উদাসীনতা থাকলেও হাইস্কুলে যেতেই বাবা অনুপ্রেরণা জোগাতে থাকেন। যদিও বাবা চিংমং মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরুতে পারেননি, কিন্তু দেশের প্রচলিত শিক্ষায় তার মেয়ে ম্যান মে উচ্চ শিক্ষিত হোক এটা শেষমেষ তিনিও চাইতেন।

ম্যান মে জানান, পঞ্চম শ্রেণি শেষ হতেই দেখা দেয় বিপত্তি। একদিকে রাখাইন সম্প্রদায়ে থাকা কুসংস্কার, অন্যদিকে পরিবারে আর্থিক টানাপোড়েনের কারণে আবার পড়ালেখা বন্ধের উপক্রম হয়। বাংলা-ইংরেজি শিক্ষাকে ভালোভাবে না দেখা রাখাইন সম্প্রদায়ের মাঝে বিদ্যমান কুসংস্কার এবং বাবার স্বল্প আয়ে কোনোভাবে দূরে গিয়ে পড়ালেখার কল্পনা করা ছিল দুঃসাধ্য। কিন্তু এখানেও সাম্প্রদায়িক গোঁড়ামির ঊর্ধ্বে উঠে ঠাকুরবাড়ির সেই উচেনা মহাথেরো ভিক্ষু ম্যান মেকে বাংলা-ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত করতে বাবা চিংমংকে ভীষণভাবে উদ্বুদ্ধ করেন।

এর পর বাবার সামান্য আয়ে কষ্ট হলেও তাকে বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার পাদ্রীশিবপুরে সেন্ট আলফ্রেডস্ হাইস্কুলে নিয়ে ভর্তি করে হোস্টেলে রেখে পড়ালেখা চালিয়ে নেন। বাবা-মাকে ছেড়ে হোস্টেলে থেকে লেখাপড়া করতে হতো অনেক সংগ্রাম করে।

সেন্ট আলফ্রেডস্ হাইস্কুল থেকে ২০০৭ সালে অনুষ্ঠেয় এসএসসিতে জিপিএ ৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হন। এর পর বাবা-মায়ের চোখেও স্বপ্ন এসে বাসা বাঁধে। নানাজনের কাছে হাত পেতে ধারদেনা করে রাজধানীর হলিক্রস কলেজে নিয়ে ভর্তি করেন ম্যান মেকে। সেখান থেকে ২০০৯ সালে জিপিএ ৫ পেয়ে এইচএসসি উত্তীর্ণ হয়। পরে ঢাকা সিটি কলেজ থেকে ফিন্যান্সে বিবিএ এবং নটর ডেম ইউনিভার্সিটি থেকে ফিন্যান্সে এমবিএ কৃতিত্বের সঙ্গে সম্পন্ন করেন।

পড়ালেখা শেষে ২০১৭ সালে বাংলাদেশ পুলিশের উপপুলিশ পরিদর্শক পদে আবেদন করেন অজপাড়াগাঁ থেকে উঠে আসা সেদিনের সেই ছোট্ট শিশুটি। উপপুলিশ পরিদর্শক পদে নিয়োগের সব ধাপে সফলতার সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়ে ২০১৮ সালে এক বছর মেয়াদি মৌলিক প্রশিক্ষণের জন্য পুলিশ একাডেমি সারদায় গমন করেন।

সেখানকার মৌলিক প্রশিক্ষণ শেষে ২০১৯ সালে ২৮ জানুয়ারি বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশে উপপুলিশ পরিদর্শক হিসেবে যোগদান করেন ম্যান মে। এখনও তিনি বিয়ের পিঁড়িতে বসেননি। ঢাকায় হলিক্রস কলেজে অধ্যয়নরত ছোট বোন ম্যাই ম্যাই রাখাইন আর মা-বাবাকে নিয়েই তার জীবন। আত্মবিশ্বাসী পুলিশের উপপরিদর্শক ম্যান মে, প্রয়াত ভিক্ষু উচেনা মহাথেরো এবং স্কুলশিক্ষক ও কলেজশিক্ষকদের সহযোগিতার কথা অকপটে স্বীকার করে তাদের প্রতি অসীম কৃতজ্ঞতার কথা জানান।

তিনি বলেন, অনগ্রসর রাখাইন জনগোষ্ঠীর প্রত্যন্ত অঞ্চলের বর্তমান প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে দেশের পাশাপাশি রাখাইন সমাজের উন্নয়নে অবদান রাখবে, এটিই আমার চাওয়া।

বাবা চিংমং আবেগআপ্লুত কণ্ঠে যুগান্তরকে জানান, সংসারের অভাব-অনটন সত্ত্বেও মেয়ের লেখাপড়ার ব্যয়ভার মেটাতে সেদিনগুলোতে এতটুক কষ্ট তাকে বুঝতে দেননি। মেয়ের আগ্রহ ও স্বপ্ন যাতে বিনষ্ট না হয়, সেদিকে তাকে খেয়াল রাখতে তার মা অংমাউ সবসময় উৎসাহ জুগিয়েছেন।

পাড়াপ্রধান বা কালাচাঁনপাড়ার মাদবর অং চো রাখাইন বলেন, রাখাইন সম্প্রদায় থেকে ম্যান মে পুলিশের উপপরিদর্শক হতে পারায় এটি আমাদের জন্য গর্বের। আমাদের সম্প্রদায়ের বর্তমান প্রজন্মকে দেশের প্রচলিত শিক্ষায় শিক্ষিত হতে অনুপ্রেরণা জোগাবে ম্যান মে।